‘সেলুকাস, কী বিচিত্র এ দেশ!’

আবদুল কাদের খান

আমাদের এ জাতিকে দারুণভাবে আঁতকে উঠার মতো একটি দুঃসংবাদ দেবো। শুনলে পিলে চমকে উঠবে! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন আমরা প্রতিদিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও টন টন বিষ ভক্ষণ করছি – বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। এ যেন নিয়তি নির্ধারিত! আমাদের নিয়তি বা ভাগ্যের চাকায় যেন এ দুর্ভাগ্য আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা!

বাংলাদেশের পাঁচ শতাধিক উপজেলায় আমরা জানি, কৃষি বিভাগ আছে এবং তাদের কর্মকর্তারা ও মাশাল্লাহ বহাল তবিয়তে সন্তোষজনক বেতনে রাজকীয়ভাবে জীবনযাপন করছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তাদেরকে দায়িত্ব কী দিয়েছেন তা মন্ত্রণালয়ই জানে। তবে দেশের চিত্র অর্থাৎ বাজার চিত্র বড্ড ভয়াবহ।

কৃষি প্রধান এই দেশের স্নায়ুকেন্দ্র গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সাথে জড়িত। এই কৃষি কাজে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বা ফসল তার জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। একথা বলা বাহুল্য, লক্ষ লক্ষ কৃষিজীবী পরিবার প্রাণপণ চেষ্টা করে প্রাণান্তকর খাটুনির মাধ্যমে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে জীবন উৎসর্গ করে ফসল ফলায়, বিক্রি করে তার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে স্ব-সপরিবারের হাল ধরে রাখে, এ কাহিনি আমাদের কাছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুবিদিত। তবে আতঙ্ক অন্য খানে। কৃষক নয়, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য, উৎপাদিত ফল ফসল। যা সম্পূর্ণ বিষে ভরা!

কৃষকের উৎপাদিত ফল-ফসল থেকে আমরা সারাদেশের মানুষ মাশাআল্লাহ টন টন বিষ খাচ্ছি। কোনো ঠাট্টা কথা নয়, রসিকতাও নয়- অত্যন্ত সত্যি কথা। আমাদের চৈতন্যের অগোচরে প্রতিদিন আমরা এই বিষ ভক্ষণ করছি। কৃষি বিভাগের পাবলিসিটি সর্বস্ব কর্মকর্তারা তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের কী শিখান জানিনা। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে যা জেনেছি, তা সত্যিই অত্যন্ত বিড়ম্বনার। সম্ভবত কৃষি বিভাগের উদাসীনতার কারণে এমনটি হর হামেশাই হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন আমাদের হেঁশেল ঘরে অর্থাৎ রান্নাঘরে যে সবজি বা আনাচ তরকারি গুলো নিয়ে আসছি তা কতটা বিশুদ্ধ তা কি আমরা জানি? একটি বর্ণনা দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দৃশ্যমান ভাবে পটল বেগুন করলা ঝিঙে বরবটি শীম, কাকুড় বাঙ্গি তরমুজ, কাকরোল মুলা পালং শাকসহ বিভিন্ন শাক সবজি বিষ এ আক্রান্ত। এইসব কাঁচা আনাচ বা তরিতরকারির প্রত্যেকটিতে রয়েছে তাজা বিষ! হ্যাঁ, তাজা বিষ। এসব সম্ভব হচ্ছে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভাবে।

কৃষকদের উপর কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি না থাকায়, দেশের অধিকাংশ কৃষক ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের উৎপাদিত ফসলে ইচ্ছা মাফিক হর হামেশা বিষ প্রয়োগ করে চলেছে। অর্থাৎ তাদের উৎপাদিত শাকসবজি ফল-ফসল পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা এবং তাজা হিসেবে বিক্রি করার জন্য প্রায়শ এন্তার কীটনাশক ব্যবহার করছে। অর্থাৎ দেদারসে বিষ প্রয়োগ চলছে। মনে হচ্ছে, এসব তদারকি করার দেখার কেউ নেই! এ লেখা প্রকাশের পর কৃষি বিভাগের গ্রামীণ পর্যায়ের বড় বেতনের ব্লক সুপারভাইজার কিংবা উপদেশ বিতরণ করা মোটা মাথা ওয়ালা উচ্চ বেতনভোগী গাড়ি বাড়ি সহ আয়াসে জীবন যাপন করা কোনো ডাকসাইটে কৃষি কর্মকর্তা হয়ত ভুরু কুঁচকে আমার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে পারেন, তাও আমি জানি। কিন্তু তবুও এটাই সত্যি এটাই বাস্তব যা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষিজীবী পরিবারের সাথে একান্ত অন্তরঙ্গভাবে আলাপ করে জানা যায়, উচ্ছে একটা তেতো সবজি তাতেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিষ প্রয়োগ করা হয় অর্থাৎ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় তাজা রাখার জন্য। কৃষকরা জানিয়েছেন, এমন পরিমাণ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় যে ওই গাছের শেকড় থেকে পাতা পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে যায়। ভুলক্রমে কোনো পোকামাকড় কীটপতঙ্গ ওই গাছের পাতায় বসলে সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়! এখন আপনারাই ভাবুন ‘উচ্ছে তাজা’ রাখার জন্য কী পরিমাণ কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়! অন্যান্য শাক-সবজির ক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যাপারটি বাদই রাখলাম! উচ্ছে একটা তেতো সবজি। ওটিও বাজারে উঠিয়ে আনার দিন সকালে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় এবং দুপুরের পর বিকালে উত্তোলন করে বাজারে আনা হয়। কি বিচিত্র তাই না? এটাই বাস্তব! এখন ভেবে দেখুন নিরীহভাবে কৃষকের সবজির ভেতর লুকানো টন টন বিষ কীভাবে সমগ্র দেশের মানুষ অজানা অবস্থায় খাচ্ছে! প্রশ্ন উঠতে পারে এত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার এর আবার এত বিশ্লেষণ কী দরকার?

বাংলাদেশের প্রতিটি উৎপাদনশীল ফসলের খেত খামার তদারকির দায়িত্ব যাদের উপর দেওয়া হয়েছে, প্রতি মাসে লম্বা অঙ্কের বেতনে! সত্যি কি তারা নিয়মিত ফসলের খেত, কৃষকের ফসলের রোগবালাই দূর করা বা কতদিন পর জমির মন ফসলের কতটুকু কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে তা কী নিয়মিত জানিয়ে থাকে? এদেরকে কি স স উপজেলায় কোনো প্রোগ্রামের মাধ্যমে রিফ্রেশার ট্রেনিং কোর্স করানো হয়ে থাকে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কৃষকের ফসলের সাথে কৃষকের সাথে এ সংক্রান্ত মনিটরিং ব্যবস্থা তা কি জোরদার আছে? আমার বিশ্বাস কৃষি বিষয়ক কর্মকর্তারা কাগজে কলমে মনিটরিং করে নিয়মিত সরকারের কাছ থেকে টিএ ডিএ উত্তোলন করেন। সরকারের এই বিভাগের চরম গাফিলতির কারণে আমাদের সংসার সমাজে কত যে ক্ষতি হচ্ছে, অদৃশ্য ঘাতক আমাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, তা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ একটুও খতিয়ে দেখেছে! সামান্য কিছু ও কী জানে?

কালে ভদ্রে শহর অঞ্চলে বিশেষ করে জেলা শহরে কোনো ভেজাল পণ্য কীভাবে খাঁটি বলে চালানো হচ্ছে তা টাস্ক ফোর্স-এর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ধরে জরিমানা করে। ঐ পর্যন্তই! নিয়মিত এ কাজগুলো শহর অঞ্চলের মতো গ্রাম অঞ্চলের উপজেলা গুলোতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর মনে হচ্ছে মতো কুম্ভ ঘুমে বছরের পর বছর মগ্ন আছে। এদের চৈতন্য কবে হবে আমরা যদিও জানি না তবে দেশের ভেজাল অস্বাস্থ্যকর পণ্যের রমরমা ব্যবসা যে তর তর গতিতে আরো দিন দিন বাড়ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

যে কথা বলছিলাম, আপনারা ক্রেতা হিসেবে দোকানির কাছ থেকে ক্রয় করা মাছে এমন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, মাছকে মাসের পর মাস সজীব থাকবে তা তাজা মনে হবে। অথচ এই অদৃশ্য ঘাতককে কেউ ধরতে পারবে না। মাছে অবাধে ফরমালিন দেওয়া হয়! অথচ তা তদারকির কোনো এজেন্সি নাই! সেনেটারি নামক এক ব্যক্তি বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ান কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। এই দুঃখ বলি কারে! বিভিন্ন মূল্যবান ফল তাজা রাখতে তাতে ব্যবহার করা হয়, কার্বাইড সহ নানা কেমিক্যাল যা প্রকারান্তরে বিষ! দ্রব্য তর তাজা দেখাতে এই যা সব প্রয়োগ করা হয় এর উপর কেউ নজর দেওয়ার মতো সম্ভবত সরকারে নেই।

তাই কাহিনি শুরুতে যে কথা বলেছিলাম, কার্বাইড ফরমালিন আক্রান্ত সমাজে আমরা আর কতকাল বেঁচে থাকবো? এই অবস্থার কি কোনো পরিবর্তন হবে না? গভীরভাবে ভেবে দেখুন সকল পর্যায়ের জনগণের খাদ্য স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে! সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ সব জানে তবুও অজ্ঞাত কারণে নিশ্চুপ। এই অবস্থার কি কোনো পরিবর্তন হবে না? সরকার বদলায় মন্ত্রী বদলায় সচিব বদলায় জেলার কর্তা বদলায় উপজেলায় কর্তা বদলায় কিন্তু হতভাগা এই অসহায় দেশবাসীর দুর্ভাগ্য মোটেও কোনোভাবেই বদলায় না। যারা দেশের মন্ত্রী-এমপি হন পার্লামেন্টে জনগণের অর্থে জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে মুখরোচক বক্তৃতা দেন। কিন্তু এসব বক্তৃতা কী তারা কোনোকালেই দিয়ে থাকেন?

আমাদের অনিয়ন্ত্রিত সবজি বাজার ফল বাজার, দৈনন্দিন খাদ্যপণ্য বিক্রির দোকানগুলো যা ইচ্ছা তাই সুস্থ স্বাস্থ্যকর বলে বিক্রি করছে তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই। জনগণ মনে করে, এসব দোকানগুলোতে ঘনঘন ঘেরাও করে সরকারের পক্ষ থেকে বাসি পচা মেয়াদ উত্তীর্ণ দ্রব্য মজুত করা দোকানি কে জেল জরিমানা করা হলে, হয়ত নিম্নমানের, পচা মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি বন্ধ হতে পারতো কিন্তু তা করবে কে? এজন্য ভোক্তাপণ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর একযোগে কাজের মাধ্যমে এ ধরনের রোগ নিরাময় সম্ভব। এ মুহূর্তে এসব সরকারি দপ্তর গুলোর কুম্ভ ঘুম ভাঙা জরুরী বলে দেশের মানুষ মনে করে। নইলে ওদের বসিয়ে রেখে মাইনে দিয়ে কি লাভ?

আমাদের দেশের কৃষকরা ফসল উঠানো পর্যন্ত কাঁচা শাকসবজিতে কতদিন পর, কখন এবং কতটুকু কীটনাশক প্রয়োগ করবে এ ধরনের তদারকের রিপোর্ট কি কৃষি বিভাগের কাছে আছে? যতদূর জেনেছি কৃষি বিভাগের উদাসীনতার কারণে অধিকাংশ ফসল উৎপাদনকারী কৃষক যথেচ্ছভাবে কাঁচা সবজি ও ফসলে নাশক প্রয়োগ করে থাকে। এর উপর কোন বাধা প্রতিবন্ধকতা নেই। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাজারে আনার ৫-৬ ঘন্টা আগেও তাদের উৎপাদিত পণ্যে বিষ অর্থাৎ কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকে । শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হয় তাই না? অথচ এটাই সত্যি!

আমাদের হোটেল রেস্তোরাঁ গুলো এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পচাবাসী খাদ্য পরিবেশন করে অধিকাংশ খাদ্য দোকানে। বিশেষ করে সিঙ্গায় ব্যবহৃত আলু এবং জ্বালানি তেল দিনের পর দিন বাসি নষ্ট হলেও তা বারবার ব্যবহার করা হয়, জনগণের বলার কিছু থাকে না। এভাবে পচা বাসি ভাত ধুয়ে গরম করে পরিবেশন করা হয় বলার কেউ নেই। মরা মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। ধরা পড়লে হইচই হয়, নইলে সব নিরিবিলি ভাবে চলছে। সেনেটারি বেতন উত্তোলন করে, বছরের পর বছর এক স্টেশনে থাকে উপরি পাওনা পায় অথচ তার কোনো দায়িত্ব নেই! সিঙ্গারা রুটি ভাত তরি তরকারি বারবার গরম করে পরিবেশন করা হয়, কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের গ্রামীণ তদন্ত ব্যবস্থা দুর্বল থাকার কারণে সাধারণ মানুষ শারীরিক নানা ব্যাধিসহ পেটের পীড়া জন্ডিসে আক্রান্ত হচ্ছে। দোকানে গিয়ে পচা দুর্গন্ধ পানি ব্যবহার করা হয় সেখান থেকেও রোগ ছড়াচ্ছে। বলার কেউ নেই। এগুলো দেখা যাবে দায়িত্ব তারা লাইসেন্স ফি এবং উপরি পাওনা নজরানা হিসেবে লেনদেনের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্য কুপোকাত করে চলেছে নিরন্তর! ওরা নজরানা পেয়ে দারুণভাবে মুগ্ধ সন্তুষ্ট সুতরাং দোকানদাররা কি করলো খাদ্যের মধ্যে ভেজাল দিল কিনা তা ধরার বা দেখার অবকাশ তাদের নেই! আসল অবস্থা সম্পর্কে উপসংহারে বলতে হয়, অবস্থা ‘যে তিমিরে সেই তিমিরেই’ রয়ে গেছে। আল আলেকজান্ডার দি গ্রেট এর সেই বিস্ময়কর জননন্দিত উক্তি : ‘সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ !’

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন